"তুমি বিয়ে করবে না, যদি করো, আমি একমাত্র ছেলে আজাদকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব।"
আজাদের বাবা আরেকটা বিয়ে করলেনই, আজাদের মা সাফিয়া তার বালকপুত্রের হাত ধরে স্বামীর রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করে একটা পর্ণকুটীরে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ছেলেকে লেখাপড়া শেখান।
মাকে আজাদ বলল, "মা, আমি কি যুদ্ধে যেতে পারি?"
মা বললেন, "নিশ্চয়ই, তোমাকে আমার প্রয়োজনের জন্য মানুষ করিনি, দেশ ও দশের জন্যই তোমাকে মানুষ করা হয়েছে।"
আজাদ যুদ্ধে গেল। দুটো অপারেশনে অংশ নিল। তাদের বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হলো। গেরিলারা আশ্রয় নিল।.... তখন, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট।
ধরা পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন আজাদকেও আটক করা হয়। তাকে ধরে নিয়ে রাখা হলো রমনা থানা সংলগ্ন ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।
ছেলের খবর পেয়ে আজাদের মা গেলেন....
গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা আজাদকে তাঁর মা চিনতে পারেন না। প্রচণ্ড মারের চোটে চোখমুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে ঝুলছে, ভুরুর কাছটা কেটে গভীর গর্ত হয়ে গেছে।
–“মা, কি করব? এরা তো খুব মারে। স্বীকার করতে বলে সব। সবার নাম বলতে বলে।“
–“বাবা, তুমি কারোর নাম বলোনি তো?"
–"না মা, বলি নাই কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরও মারে, যদি বলে দেই…!"
–"বাবারে..., যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম বলো না।"
–"আচ্ছা মা। ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।"
–"আচ্ছা, কালকে যখন আসব, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসব।"
সাফিয়া বেগমের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গায়ে হাত তোলা তো দূরে থাক, ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দেননি কোনোদিন। সেই ছেলেকে ওরা এভাবে মেরেছে… এভাবে…
পরদিন মুরগির মাংস, ভাত, আলুভর্তা আর বেগুনভাজি টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পরদিন সারারাত রমনা থানায় দাঁড়িয়ে থাকেন সাফিয়া বেগম কিন্তু আজাদকে আর দেখতে পাননি....।
তেজগাঁও থানা, এমপি হোস্টেল, ক্যান্টনমেন্ট-সব জায়গায় খুঁজলেন, হাতে তখন টিফিন ক্যারিয়ারটা ছিলো কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পেলেন না মা।
ছেলে একবেলা ভাত খেতে চেয়েছিল মা পারেননি ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে। সেই কষ্ট-যাতনা থেকে পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তুলেন নি আজাদের মা!
তিনি ১৪টা বছর অপেক্ষায় ছিলেন ছেলেকে কটা ভাত খাওয়াবেন...।
তাঁর বিশ্বাস ছিলো... তাঁর আজাদ ফিরবে। ছেলের অপেক্ষায় শুধু ভাতই নয়, ১৪বছর তিনি কোন বিছানায় শোন নি সেই সাফিয়া।
মেঝেতে শুয়েছেন শীত গ্রীষ্ম, কোন কিছুতেই তিনি পাল্টান নি তার এই পাষাণ শয্যা .... কারণ রমনা থানায় আটককালে বিছানা পায় নি তাঁর আজাদ.....
৩০শে আগস্ট রাতে রুমী, আবু বকরদের মতো আজাদকেও রাজাকারদের সহযোগিতায় ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে পাকিস্থানী আর্মিদের দ্বারা অমানবিক নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয় বকর রুমি বদি সহ ওরা সাতজন । নাক-মুখ ফেঁটে রক্ত বের হয়েছে, কোটর থেকে চোখ খুলে এসেছে, হাড়গোড় ভেঙ্গে দিয়েছে, অসহ্য ব্যাথায় চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছে, এতকিছু সয়েও ওঁরা একটি বারের জন্যেও মুখ খুলেনি।.... এরপর ওদের ভাগ্যে কি ঘটেছে আজও কেউই জানেনা!
আজকের দিনেই সেই কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ জন্মে ছিলেন.…
শুভ জন্মদিন শহীদ আজাদ।
শহীদ আজাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর অঙ্গীকার, "আমরা তোমাকে ভুলবো না, ইনশাআল্লাহ।"
(তথ্য সূত্র : মা/ আনিসুল হক।)






0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা