শা'বান মাসের একদম শেষ প্রান্তে আমরা। আর একদিন পরেই রমজান মাস শুরু হচ্ছে। আমাদের জীবদ্দশায় এমন অদ্ভুত রমজান আমরা আর পাইনি। সাধারনত রমজানের সাথে একরকম ফেস্টিভিটি জুড়ে থাকে। মানুষ প্রচূর বাজার করে। রেস্তোরাঁগুলো ইফতার আর সেহরির প্যাকেজ অফার করে পশরা সাজানোর প্রস্তুতি নেয়। ইদানীং পত্রিকাগুলো ইফতার রেসিপি নিয়ে বিশেষ পাতার আয়োজন করে। মসজিদ গুলো তারাবিহর জন্য প্রস্তুত করা হতে থাকে। ছোটবেলা থেকে এটাই রমজানের চিরাচরিত প্রস্তুতির চিত্র।
এই বছর এর কিছুই নেই। সমগ্র জনপদ গৃহবন্দি। রেস্তোরাঁ বন্ধ। রমজানের জন্য বাজার করার বাহুল্য নেই। মসজিদ গুলো তালা দেয়া। এবার হয়তো মসজিদে তারাবিহ হবে না। হাফেজ সাহেবের দ্রুতগতির তেলাওয়াত শুনে সালাত আদায় করার পরিবর্তে নিজেকেই আল্লাহর সামনে আয়াত পড়তে হবে। বাড়ি গুলোতে ইফতারের উৎসবও হবেনা। কর্পোরেট ইফতার পার্টির কোন তোড়জোড় নেই। চারপাশেই রয়েছে বিপন্ন এবং অভাবগ্রস্ত মানুষ। আল্লাহকে কর্জে হাসানা দেয়ার কি উৎকৃষ্ট এক অন্য রকম রমজান!
আমরা অনেকেই ইসলামের ইতিহাসের প্রথম রমজানের কথা জানি না হয়তো। রমজান মাসে রোজা রাখার বিধানের আদেশ হয় রাসুলাল্লাহ (সাঃ) মদিনায় হিজরত করার দ্বিতীয় বছর। শা'বান মাসে আল্লাহ্ জানিয়ে দিলেন পরের মাসে রোজা রাখতে হবে। মদিনার অবস্থা তখন একদম ভাল নয়। আওস আর খাজরাজ - এই দুই গোত্রের বাস ছিল মদিনায়। ইসলাম আসার পর তাদের বহুবছরের গৃহযুদ্ধ থেমেছে মাত্র। কিন্তু এই গৃহযুদ্ধে ধ্বংস প্রায় অর্থনীতি। তার উপর মক্কা থেকে হিজরত করে আসা একদম নিঃস্ব মুসলিমদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে মদিনার। ভয়ংকর অনিশ্চিত একটা সময়। তার উপর মক্কার শক্তিশালী এবং সম্পদশালী কুরাইশদের হুমকি। এই অবস্থাতেই মুসলিমদের জীবনের প্রথম সিয়াম সাধনার রমজান আসলো। সেই রমজানেই সংগঠিত হল কুরাইশদের সাথে প্রথম যুদ্ধ - বদরের যুদ্ধ। ইসলামের প্রথম রমজানও ছিল এক ভীষন রকম সংগ্রামের মাস - অর্থনৈতিক দূর্যোগ, নতুন একটা জাতির অনিশ্চিত যাত্রা, আর এক প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ।
হাজার বছরের পরিক্রমায় আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম রমজানের সত্যিকার স্পিরিট। রমজান ইফতার পার্টি আর খাদ্য উৎসবের মাস তো নয়। এই মাস আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের মাস, যেন আমরা মুত্তাকি হতে পারি। রমজান কুরআনের মাস। লাইলাতুল কদরের মাস। রহমত, মাগফিরাত ও দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মাস। আল্লাহ্ এভাবেই রমজানের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন।
তাই এই দূর্যোগ একজন মুসলিমের জন্য আশীর্বাদ। হারিয়ে যাওয়া রমজানকে খুঁজে পাওয়ার এক অসাধারন সুযোগ। সেই প্রথম রমজানের মুসলিমদের মত পরিমিত খাওয়া, সাধারন জীবন, আর শুধুই ইবাদতের মাস রমজান। অফিসের ব্যাস্ততা নেই, শপিং আর ইফতার পার্টির চাপ নেই, সামাজিকতার বাহুল্য নেই। শুধুই আছে প্রশান্ত চিত্তে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে হারিয়ে যাওয়া যোগাযোগ নতুন করে তৈরী করার সুযোগ। সেই প্রথম রমজানের মত ভয়ংকর অনিশ্চিত সময়ে আল্লাহ্র রহমতে শান্তি খুঁজে পাওয়ার সুযোগ।
এই অসাধারন সংযমের রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেয়ার সময় এখনই। আমাদের অতীতের সকল সীমালঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আল্লাহ্র সাথে আমাদের সম্পর্ক তৈরীর নতুন পৃষ্ঠা এই রমজান।
দ্বিতীয় হিজরীর সেই প্রথম রমজানের মত আসুন এই রমজানকে আমাদের তাক্বওয়া অর্জনের উপলক্ষ্য বানিয়ে ফেলি। আল্লাহ্ এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে অসাধারন এক সুযোগ দিয়েছেন। সাহাবায়ে একরামদের জীবন হাতে কলমে অনুসরণ করার সুবর্ণ সুযোগ। আসুন ১৫০০ বছর আগের সেই প্রথম রমজানকেই আবার নিয়ে আসি এবার আমাদের জীবনে। আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দান করুন এবং মুত্তাকী হিসাবে কবুল করুন।
(সংগৃহীত এবং ইষৎ পরিমার্জিত)
* উপরের লেখাটির মুল লেখক কে আমি জানিনা। আমি যেখান থেকে নিয়েছি সেখানে শেয়ার করার অপশন ছিলোনা। তিনিও সংগৃহীত কথাটি উল্লেখ করে রেখেছিলেন। আমার খুব ভালো লেগেছে বলে আমি কপি পেষ্ট করেছি। সেক্ষেত্রে কিছুটা সময়োপযোগী করে এবং কিছু শব্দ বাক্য সংযোজন করে পোস্ট করেছি। এই লেখার উসিলায় আল্লাহ যদি আমাদের কিছুটা হেদায়েত দান করেন তবে তার নেকী আল্লাহ অবশ্যই মুল লেখককে দান করবেন। কেউ কেউ লেখাটি আমার মনে করে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। মুল লেখকই সেই প্রশংসার ন্যায্য হকদার।

0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা