অগ্নিযুগের সিংহ পুরুষ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা, বিপ্লবী রবি নিয়োগী। আজ ২৯শে এপ্রিল তাঁর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী।
তিনি ১৯০৯ সালের এই দিনে শেরপুর শহরের পুরান গোহাটা এলাকায় কংগ্রেস রাজনীতিবিদ পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী ও মাতা সূরবালা নিয়োগীর ঘরে জন্ম গ্ৰহন করেছিলেন এবং ২০০২ সালের ১০ই মে ইহলোকে ত্যাগ করেছেন।
বিপ্লবী রবি নিয়োগী সারাজীবন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার এই বিরল উদাহরণ যা আজকের প্রেক্ষাপটে এই দেশে কল্পনাতীত। তিনি যে কেবল একজন রাজনীতিক ছিলেন তাই নয়। তিনি তাঁর জীবনে সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন করেছেন। ব্যক্তিজীবনে সাংবাদিকতা ছিল তাঁর প্রিয় পেশা। তিনি দৈনিক সংবাদে মানুষের জীবন ও জীবিকার কথা তুলে ধরে উন্নয়নের কথা বলতেন।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কারণে তাঁর জীবনের ৩৪ বছর তাঁকে কারাবাসে থাকতে হয়েছে। তৎকালীন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসনেও মেতে হয়েছে। তাঁর জীবনের একটাই ব্রত ছিল তা হচ্ছে, মানুষের মুক্তি, মানুষের জীবনের উন্নতি। সাধারণ মানুষের জন্য তিনি তাঁর জীবন বিলিন করে দিয়ে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজীবন মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।
রবি নিয়োগী ১৯২৬ সালে শেরপুর গোবিন্দ কুমার পিস মেমোরিয়াল হাইস্কুল(বর্তমান জি. কে. পাইলট স্কুল) থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে গিয়ে আই.এ -তে ভর্তি হন কিন্তু ১৯২৭ সালে ঐ কলেজের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হওয়ার কারনে রবি নিয়োগী সহ কিছু ছাত্রদের কলেজ থেকে বহিষ্কার ঘোষণা করা হয়। এরপর তিনি সেখান থেকে গিয়ে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়ন কালেই তিনি বিপ্লবী যুগান্তর দলের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯২৯ সালে সেখান থেকেই আই.এ পাস করে ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ময়মনসিংহে সংঘটিত সত্যাগ্ৰহ আন্দোলনে তিনি বিশাল ভূমিকা নেন। উল্লেখ্য যে ঐ আন্দোলনের কারণেই রবি নিয়োগী সহ ১৭ জন বিপ্লবী গ্ৰেফতার হয়েছিলেন।
১৯৩০ সালের মাষ্টার'দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্রগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অব্যাহতির পরে ময়মনসিংহের যুগান্তর দলের যে কয়জন নেতা কর্মীকে গ্ৰেফতার করা হয়েছিল রবি নিয়োগী ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। ১৯৩১ সালে শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকার সালদার জমিদার বাড়িতে যুগান্তর দলের হামলার কারণে রবি নিয়োগী'র ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। তাঁকে প্রথম রাজশাহী জেলখানায় পাঠানো হয় কিন্তু একজন বিপদজনক আসামী বলে তাঁকে সেখান থেকে আন্দামান সেলুলার জেলে স্থানান্তর করা হয়, তিনি সারে ৫ বছর জেল জীবন কাটান। সেখানে তিনি দীক্ষিত হন বড়ো বড়ো সাম্যবাদী নেতাদের কাছে।
১৯৩৭ সালে গঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সংসদীয় সরকারের আমলে তিনি মুক্তি পেয়ে ময়মনসিংহে গিয়ে সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।
রবি নিয়োগী ৪০-এর দশকে ময়মনসিংহে কৃষক আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে আত্ম নিযোগ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালের ময়মনসিংহের নালিতাবাড়ীতে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ৫-৯ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে নেত্রকোনায় যে সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় রবি নিয়োগী ছিলেন তার মূল উদ্যোক্তা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি ময়মনসিংহ কমিউনিস্ট পার্টি ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও ময়মনসিংহ কমিউনিস্ট পার্টির একজন অন্যতম নেতা ছিলেন।
সারাজীবনে রবি নিয়োগী'র আন্দোলন আর সংগ্ৰামের যেমন শেষ ছিল না তেমনি শেষ ছিল না তারজীবনে জেল, জুলুম হুলিয়া'র।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতেই তেভাগা আন্দোলনে অংশ গ্ৰহন করার কারণে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তাঁকে একটানা ৫ বছর জেলবাস করতে হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা সারা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য যে নেতাদের খুঁজে খুঁজে বের করে এরেষ্ট করা হয়েছিল রবি নিয়োগী তাদের একজন ছিলেন। তখনো তিনি দুই বছর কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তাঁর কারাজীবনের সমাপ্তি ঘটে।
১৯৯১ সালের ২৫-২৮শে ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাই নগরীতে অনুষ্ঠিত জীবিত-আন্দামান বন্দিদের যে সন্মাননা প্রদান করা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে রবি নিয়োগীকেও আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
রাজনীতি, সাংবাদিকতা ছাড়াও লেখক হিসেবেও তিনি অবদান রেখেছেন বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে। তাঁর লেখা একাত্তরের বিজয়গাঁথা: শেরপুর, শেরপুর ইতিহাসে মুসলিম অবদান এবং তেভাগা আন্দোলন, সংগ্ৰাম ও ভবিষ্যৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কর্ম।

0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা