
'শোনা যায় নারী কন্ঠের আর্তনাদ ॥ প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙ্গে গোঙ্গানি শব্দে’
সাইদুর রহমান রিমন-এর বিশেষ প্রতিবেদন : সাভার গার্লস স্কুল সংলগ্ন কিশোর গ্যাংয়ের জঙ্গল আস্তানায় ভার্সিটি ছাত্র বাবু ও স্কুল ছাত্রী নীলা রায়ের প্রাণই শুধু কেড়ে নেওয়া হয়নি, সেখানে যে কত শত মেয়ের সর্বনাশ ঘটেছে তার ইয়োত্তা নেই। দিনের বেলায় স্কুল ফেরত ছাত্রী আর সন্ধ্যার পর গার্মেন্টস ফেরত মেয়ে কর্মিরাই নেশাগ্রস্ত কিশোর গ্রুপের কবলে পড়ে নানা নির্মমতার শিকার হতেন। এদের মধ্যে যারা সারা রাতের জন্য আট্কে পড়তেন, তাদের যেন দুর্দশার শেষ ছিল না।
অপরাধ আস্তানা সংলগ্ন বাড়িঘরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হরদম মাদক সেবন, নেশাখোরদের হৈচৈ আর মারধোরের নানা শব্দ শোনা যেতো। সন্ধ্যা পেরোলেই আস্তানাটি যেন মৃত্যুপুরী হয়ে উঠতো। সংলগ্ন বাড়িঘরের নারী সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রায় রাতেই অপরাধ আখড়া থেকে শোনা যেতো নারী কন্ঠের আর্তনাদ, গোঙ্গানীর শব্দ। গভীর রাতে এসব ভয়ার্ত শব্দেই বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙ্গার ঘটনা ঘটতো বলেও ভুক্তভোগিরা জানিয়ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ২০ সেপ্টেম্বর এ আস্তানায় স্কুল ছাত্রী নীলা রায়ের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর পরই চিহ্নিত অপরাধীরা এলাকা ছেড়ে উধাও হয়ে যায়। গত ৭/৮ দিন তাদের কাউকে রাস্তাঘাটেও দেখা যায়নি। কিন্তু গত মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে আবার কয়েকজন সন্ত্রাসীর আনাগোনা লক্ষ্য করছেন প্রতিবেশিরা। গ্রেফতার এড়িয়ে দুর্বৃত্তরা বহাল তবিয়তে বিচরণ করতে পারায় সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আরো বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, প্রেম প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ার অপরাধে (!) গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভাইয়ের কাছ থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্রী নীলা রায়কে ছিনিয়ে নিয়ে এ আস্তানাতেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ নৃশংস ঘটনার পর থেকেই অপরাধ আস্তানাটি সকলের নজরে আসে। স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী এক আওয়ামীলীগ নেতার ছেলে শাকিল ও সাকিবের তত্বাবধানে গড়ে তোলা এ আস্তানা ঘিরে শতাধিক কিশোর সন্ত্রাসীর হরদম আড্ডা থাকে। সেখানে খোলামেলা ভাবেই বসে মাদকের আসর। তাছাড়া চাঁদা আদায়ের জন্য বিভিন্ন লোককে অপহরণ করে এনে আটকে রাখা, যাকে তাকে ধরে এনে ঘন্টার পর ঘন্টা নির্যাতন চালানো, নারীনিগ্রহ থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ অপকর্ম চলে বাধাহীনভাবে। কিশোর গ্যাংয়ের দুর্ভেদ্য এ ঘাটি ঘেষা বাড়িঘরের ভীতসন্ত্রস্ত বাসিন্দারা ভয়ার্তকন্ঠে এসব কথা জানিয়েছেন। ভয়ঙ্কর এ দুর্বৃত্তদের ভয়ে একটানা কয়েক বছর ধরে এসব বাসিন্দা তটস্থ জীবন যাপন করে আসছেন। সন্ধ্যা পেরোলেই বাসা বাড়িগুলোর দরজা জানালা বন্ধ করে রীতিমত জিম্মীদশায় দিনাতিপাত করেন তারা। বাসিন্দারা শুধু বলেছেন, এ জঙ্গল আস্তানায় নিত্যদিনই ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ঘটে থাকে, সেসব কথা এলাকার কে না জানে? কিন্তু চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসেন না কেউ।
তরুণী এক গৃহবধূর পরিচয়ের সূত্র ধরে আস্তানা ঘেষা এক বাড়িতে বেড়ানোর ছুঁতোয় কিছু সময় অবস্থান করেন এ প্রতিবেদক। বাড়ি সংলগ্ন জঙ্গলাকীর্ণ আখড়াকে তারা সবাই ‘পাপের আস্তানা’ বলেই চিনে জানে। চারদিকে দেয়াল ঘেরা এ আখড়ায় রাত দিন চলতো নেশার আসর। কী দিন, কী রাত-সব সময়ই এ নেশার আখড়ায় ১৫/১৬ জন কিশোর তরুণের অবস্থান থাকে। কথাবার্তা, আচরণে এসব কিশোর দুর্বৃত্ত খুবই বেপরোয়া। জঙ্গলাকীর্ণ আস্তানার যত্রতত্র রাখা হতো লাঠিসোটা, রড, হকিস্টিকসহ ধারালো অস্ত্রশস্ত্র। গার্লস হাইস্কুল সংলগ্ন পেছনের সড়কে ছাত্রীদের যাতায়াত সময়ে কিশোর দুর্বৃত্তরা একাধিক মোটর সাইকেল নিয়ে বেপরোয়া গতিতে মহড়া দেয়। প্রায়ই তারা ছাত্রীদের গায়ের উপর মোটর সাইকেল চড়িয়ে বিকৃত উল্লাসে মেতে উঠে। তবু তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস কেউ পায় না। সাভার পৌর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, সিরুর রাজনৈতিক প্রভাবে তার গুণধর পুত্র শাকিল-সাকিব ও তাদের সহযোগিরা নির্বিঘেœ অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছিল। নীলা হত্যার প্রধান আসামি মিজান গ্রেফতার হলেও তাকে সহযোগিতাকারী সাকিব-জয়কে থানা থেকেই রাতের অন্ধকারে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ঙ্কর সদস্যরাও কেউ কেউ গ্রেফতার এড়িয়ে এলাকাতেই বুক ফুলিয়ে বিচরণ করছে। তাদের বিপজ্জনক হোন্ডা মহড়াও চলছে যথারীতি। ফলে এখনও সাভারের বিভিন্ন মহল্লাবাসী অজানা শঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত।জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
গ্যাং কালচারে তারা ভয়ঙ্কর
সাভারে গ্যাং কালচারের নামে ভয়ংকর হয়ে উঠছে উঠতি বয়সের কিশোররা। সম্প্রতি সাভারের বিভিন্ন এলাকা ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য মারামারি, অস্ত্র প্রদর্শন, শো-ডাউনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ড সাথে চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সাভার পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডে কিশোর জগতের ভয়ংকর এক অপরাধীর নাম সায়েম রহমান সাদাফ ওরফে মুন্সি সাদাফ। এলাকার দাপট ব্যবহার করে তার নেতৃত্বে রয়েছে একটি কিশোর গ্যাং। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, বুন্ধদের নিয়ে মাদক সেবন, চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত এই গ্যাংটির সদস্যরা। স্কুল পড়–য়া উঠতি বয়সের কিশোরদের নিয়ে পরিবারের অজান্তেই মাদকসহ নানা অপকর্মের সাথে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ছাত্রলীগের কোন কমিটিতে নাম না থাকলেও ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়ায় সে।
সাভারে সম্প্রতি কতিপয় নেতারা কিশোর গ্যাং বানিয়ে গুন্ডামি করছে, দেয়ালে স্প্রে করে নিজের নাম লিখছে। কথিত বড়ো ভাইদের সাথে আড্ডা থেকে শুরু হওয়া এসব গ্যাং থেকে পরবর্তীতে শুরু হয় বিভিন্ন অপরাধমূলক কমপ্রান্ড। অনেকে মাদক বা ছিনতাইয়ের মতো কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। সাভারে এমন নানা গ্যাংয়ের নাম চোখে পড়ে। মূলত স্কুলে পড়তে গিয়ে কিংবা এলাকার আড্ডায় মজার ছলে তৈরি হওয়া এসব গ্রুপ পরবর্তীতে মাদক, অস্ত্র এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ে। সাভারের ব্যাংক কলোনী, ওয়াপদা রোড, আড়াপাড়া, বাড্ডা ভাটপাড়া, রাজাশন, আশুলিয়ার ডেন্ডাবর, কুড়গাও, ঘোষবাগ এলাকায় কতিপয় কিশোররা নানা অপকর্মে জড়িয়েছে।
কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় রাজাশনের ঈদগাহ মাঠ এলাকায় দাপিয়ে বেড়ায় ফাতিন, সজিব, সুজন। যাদের মধ্যে সজিব মাদক ব্যবসায়ী আর সুজনের নেতৃত্বে প্রতি সন্ধ্যায় এলাকার সুফিয়া বেকারীর মোড়ে মাচার ওপর বসে মাদক সেবনের আসর। রাজাশন গ্যারেজ এলাকায় মিঠু ও ঘাসমহল এলাকায় হৃদয় নামে আরেক কিশোর উঠতি বয়সের ছেলেদের কাছে টাকা বিনিময়ে সরবারহ করছে গাঁজা, হোরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় শ্রাবণের নেতৃত্বে রয়েছে একটি কিশোর আপরাধী দল। এলাকার বন্ধুরা মিলে একসাথে গাঁজা সেবন, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সাথে যুক্ত তারা। সাভারের জামসিং বাটপাড়া এলাকার আলোচিত একটি হত্যাকান্ডেরও আসামী শ্রাবনসহ তার গ্রুপের সদস্যরা।
0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা