শেষ খবর

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widge

Responsive Advertisement

মুরগি দেখেছেন? মুরগি? নগরবাসীরা ...

ধন্যবাদ Niaj Morshed আমরা ফেইসবুক ভয়েজে 

ভালোলাগার, দেশের কথার, দেশের কথার বিশেষ বিশেষ অংশগুলো তুলে রাখি। আজ আপনার কথাগুলি।

নিচে ফেইসবুক ইউজার নিয়াজ মোর্শেদ-এর স্টাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হয়েছে,

মুরগি দেখেছেন? মুরগি? নগরবাসীরা আজকাল দেখেন না, কিন্তু গ্রাম-মফস্বলে গেলে দেখবেন, রাস্তার ধারে মুরগি বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে কক কক করতে করতে ঘোরাফেরা করে।

এখন সমস্যা হয় যখন এই রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি যায়। মুরগিটা হয়তো আরামসে রাস্তার বামপাশে হাটাহাটি করছিল, কিন্তু গাড়ির শব্দ শোনার সাথেসাথে তার প্যালপিটিশন শুরু হয়ে যাবে। সে ভয়ের চোটে পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে রাস্তা পার হতে যাবে। ততক্ষনে গাড়ি এসে যাবে, বাচ্চাকাচ্চা সহ তাকে পিষে দিবে। এটা বাংলার রাস্তায় চলতে গেলে হরহামেশাই দেখা যায়। কিন্তু মুরগির এত বুদ্ধি কম কেন? এত গাধা কেন মুরগি?

কারন হল, ঐ মুরগিটা সারারাত কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে সকালবেলা একটা ডিম পেড়ে পশ্চাদ্দেশের ব্যথায় দাঁড়াতে পারছে না। সারারাত কষ্ট করে সকালবেলা দুটো পোকা খেতে এসেছিল রাস্তার ধারে। ঐ মুরগিটাকে আপনি বুঝাতে পারবেন না যে, "বাবা মুরগি, গাড়ি এলে ভয় পেয়ে রাস্তা পার হওয়ার দরকার নাই, যেখানে আছ সেখানেই থাকো। ভয় নাই।"

মুরগিটার ঐ মূহূর্তে এতকিছু চিন্তা করার ক্ষমতা নাই, গাড়ির গতি মেপে রাস্তার এপার থাকতে হবে না ওপার যেতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার ধৈর্য তার নাই। তাই এই মুরগিটার জীবন রক্ষার দায়িত্ব যতটা না এই মুরগির নিজের, তার চেয়ে বেশি এই মুরগির পালনকর্তার।

এখন ব্যাপার হইল এই মুরগিটা হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। এইদেশের নিরীহ মানুষগুলা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দুদিনের জন্য দুনিয়ায় বাঁচে। এই দুদিনের খাবার জোগাড় করতেই তারা হিমশিম খায়।

চল্লিশ বছর বয়সী যে দিনমজুর লোকটা সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে সন্ধ্যাবেলা গেরস্তের বাড়ির গেটে বসে আছে, আড়াইশ টাকা পেলে দুটো বাজার করে নিয়ে বাড়ি যাবে, রান্না হবে, রাতের ভাত হবে, তারপর খাওয়া হবে, সেই লোকটাকে আপনি হাই থটের জিনিস বুঝাতে পারবেন না।

ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দুচালা বাড়ি, ১০ বিঘা জমি আর কিছু নগদ টাকার সাথে একটা ভাল পরিবেশও রেখে যেতে হবে- এতকিছু বুঝার সময়, ধৈর্য কোনকিছুই ওই লোকটার নাই। ঠিক ঐ রাস্তার ধারের মুরগিটার মতোই এই নিরীহ লোকটার বাচ্চাকাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও তার পালনকর্তার। সোজা কথায় রাষ্ট্রের।

কোন পরিপ্রেক্ষিতে এত কথা? বলছি, দাড়ান, আরেকটা ঘটনা আগে বলি। আশেপাশে গাইনি ডাক্তার আছে? থাকলে খোজ নিয়ে দেখবেন, দৈনিক কত শত নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রী ঐ চেম্বারের চক্কর কাটে। কারন?

কারন বাচ্চা হয়না। দুইদিন আগে বাচ্চা হওয়া ঠেকানোর জন্য টিভিতে সকাল বিকাল এড দিত, দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়। এখন খোঁজ নিয়ে দেখেন আপনারই মামা চাচা খালু ভাই বেরাদার এই বিপদে পড়ে আছে। ডিভোর্স রেট হুহু করে বাড়ছে। কারন? কারন মেয়েরা শিক্ষিত হইছে? মেয়েরা সংসার করতে চায়না, কাজ করতে চায়? হ্যাঁ এগুলা হয়ত বাইরের কারন, কিন্তু অনেক বড় একটা কারন ভিতরে, বিছানায়। সবকিছু খুলে বলতে হয়না। তার চেয়ে কিছু তথ্য দিই চলেন,

১৯৬০ সালে এভারেজ পুরুষের সিমেন এ স্পার্ম থাকত গড়ে ১০০ মিলিয়ন। মাত্র ৫০ বছরের "উন্নয়নের" চোটে ২০১১ সালে দেখা যায় স্পার্ম পাওয়া যাচ্ছে ৪৯ মিলিয়ন। কি অসাধারন না? একইভাবে মায়েদের গর্ভপাতের আশঙ্কা বর্তমানে প্রতিবছর বাড়ছে ১% হারে। মানে আজ থেকে ২০ বছর পর আমাদের বাচ্চাগুলো (যদি হয় আরকি) গর্ভেই মারা যাবার সম্ভাবনা আজকের চেয়ে ২০% বেড়ে যাবে। এগুলা নিয়ে আপনার চিন্তা না থাকলে এইটা শুনেন, গত ১০০ বছরে সারা পৃথিবীতে ছেলেদের গড় পুরুষাঙ্গের আকার কমে যাচ্ছে ১০ থেকে ২০ পার্সেন্ট।

এইবার আসল কথায় আসি। কারন কী এসবের? যেই মানবপ্রজাতি গত আড়াই লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে সহি-সালামতে টিকে আছে, হঠাত করে তার এত বিপত্তি কেন?

কারন অনেক। নাম্বার দিতে হবে, নাহলে গুলিয়ে যাবে, তারপরেও সব বলা সম্ভব হবেনা।

১। প্লাস্টিক। সকালে উঠে বাথরুমের বদনা থেকে শুরু করে ভাতের থালা, পানির গেলাস, দাঁতের খিলান, হাতের তসবি, এমন কিছু বাদ নাই, যেখানে আমরা প্লাস্টিক ঢুকাইনাই। এই প্লাস্টিকগুলার প্রতি পরতে পরতে এমন কিছু কেমিক্যাল থাকে, যেগুলা আমদের শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে গাঁজা খাওয়ায়। শরীর টাশকি খেয়ে বুঝতে পারেনা আপনার ছেলে হওয়া উচিন নাকি মেয়ে। এই কেমিক্যালগুলাকে বলা হয় EDCs. সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন।

এর পর সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক তো আছেই। সেদিন গ্রামে গিয়ে ১০ টাকার আদা কিনতে গেলাম, সাথে ব্যাগ নিয়ে গেছি, পলিথিন নিব না তাই। দোকানদারকে "পলিথিন লাগবে না" বলার পরও সে জোর করে দিয়ে দিল। না লাগলে ফেলে দিবেন, কিন্তু দোকানদার ভদ্রতা করে আপনাকে পলিথিন দিচ্ছে, আপনি নিবেন না, এটা কেমন কথা!

তো পলিথিন নিলে সমস্যা কী, প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাইলে সমস্যা কী? এগুলা তো আমরা চিবিয়ে খাচ্ছিনা, তাহলে হরমোনের সমস্যা হবে কেম্নে?

সমস্যা হইল, এই যে পলিথিনটা আমি ফেলে দিলাম, এইটা কালকে ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেয়া হবে নদীর ধারের ভাগাড়ে, বর্ষার পানিতে সেটা যাবে নদীতে। নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে পাথরের সাথে ধাক্কা লাগতে লাগতে সেটা ছিড়ে টুকরো হবে। কয়েক বছরের মধ্যে এতই ছোট টুকরা হবে যে মাছের খাদ্যের সাথে মিশে যাবে। মাছেরা সেই পলিথিন খাবে। আর সেই "নদীর টাটকা পাবদা" হাজার টাকা কেজি দরে খাবেন আপনি। কি সুন্দর না, আমার পলিথিন আপনার শরীরে, আপনার পলিথিন আপনার বাচ্চার শরীরে। খুশি?

খুশি না হয়ে উপায় নাই। এটা মোটেও ভবিষ্যতের কথা নয়, এটা বর্তমানের কথা। মাছের পেটে এখন কোটি কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক। বিশ্বাস না হলে Microplastic in fish লিখে গুগলে সার্চ দিতে পারেন।

২। কেমিক্যাল। গ্রামের হাটে আদা কিনার পর গেলাম শশা কিনতে। এক ডালা ভর্তি বিরাট বিরাট শশা নিয়ে চাচা বসে আছে। পানি ছিটাচ্ছে দু'সেকেন্ড পরপর। একটা শশা তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতেই চাচা গর্বের সহিত বললেন, "একটাও পোকা নাই ভাতিজা, সকালেই ওষুধ দিয়ে তুলে আনছি।"

শুনে আমার বুক ধরফর শুরু হয়ে গেল। কী গর্বের সাথে এরা বিষ খাওয়াচ্ছে নিজের বাচ্চাকাচ্চাকে! এক বেগুন চাষী চাচার সাথে কথা বললাম কদিন আগে। বেগুন ফলন শুরু হওয়ার পর থেকে বাজারে উঠানোর আগ পর্যন্ত ছয় থেকে আট বার বিষ দেয়া হয় পোকা থামাতে। এমনকি সকালে বিষ দিয়ে দুপুরে বাজারে তোলা হয়।

শুধু বিষ বললে অন্য কেমিক্যালদের বিশেষ ছাড় দিয়ে দেয়া হয়। যে চিপসের প্যাকেটটা বাচ্চাকে আদর করে কিনে দিচ্ছেন, যে প্রসেসড ফাস্ট ফুডটা চটকদার বলে সকাল বিকাল পার্টি করে খাচ্ছেন, এগুলা আজকে আপনার কিছু করছে না। কিন্তু এগুলা কৃত্রিম, আড়াই লক্ষ বছরে মানুষ এগুলা খায়নি, গত ৫০ বছরে খেতে শুরু করেছে, আমাদের শরীর জানেনা এই এলিয়েন কেমিক্যালগুলোকে কী কাজে লাগাতে হবে।

ফলাফল, আমার বাপ মা, চাচা ফুফু খালু সবার একটা করে ওষুধের বক্স, বেশি না, দৈনিক সবাইকে গড়ে গ্যাসের বড়ি, হজমের বড়ি, ঘুমের বড়ি, ব্যাথার বড়ি সহ ৫ থেকে ১০ টা বড়ি খেতেই হয়। মজা না? খুব মজা।

এখনো গ্রীন হাউজ ইফেক্ট, সমুদ্রের পানিতে দেশ ডোবার কথা, মাটির তলের পানি তুলে শেষ করে ফেলার কথা, অনেক কিছুই বাকি আছে। আর লিখতে পারছি না, আপনারও পড়ার ধৈর্য হবেনা।

এই "পরিবেশ", "নিরাপদ খাদ্য", "ভবিষ্যত" এই টপিকগুলা এমন, যে এগুলা কাউকে গুলিয়ে খাওয়ানো যায়না। এই চিন্তাগুলো ভিতর থেকে আসতে হয়। দুঘন্টা বসে ভাবতে হয়, আমি মরার পর আমার বাচ্চাগুলো কি শুধু টাকাই খেয়ে বাঁচবে, নাকি একটু নিরাপদ পানিও লাগবে, শ্বাস নেবার জন্য একটু অক্সিজেনও লাগবে?

মুরগির যে কথাটা বলেছিলাম। এদেশের খেটে খাওয়া ১০ কোটি মানুষকে এতবড় কঠিন কথাগুলো বুঝানো অসম্ভব। তাদের জন্য ভবিষ্যতটা দায়িত্বশীলদের ঠিক করে দিতে হবে। এই খেটে খাওয়া মুরগি-মানুষগুলোর বাচ্চাকাচ্চারা যেন দূষন-গাড়ির চাপা না পড়ে, দায়িত্বশীলদের একটু খেয়াল রাখতে হবে।

প্লাস্টিকের বদলে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক, কেমিক্যাল ও বিষমুক্ত কৃষিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্বুদ্ধ করা, যারা এসব নিয়ে আবিষ্কারের ধান্দায় ছোটাছুটি করছে- তাদের একটু হলেও মর্যাদা দেওয়া, পরিবেশ সংরক্ষনে যারা দৌড়াদৌড়ি করছে- তাদের উপহাসের পরিমানটা একটু কমানো, এই সবই করতে হবে ধীরে ধীরে। সবার আগে দায়িত্বশীলরা, আপনারা আমাদের বাপ মা, আপনাদের যে সত্যিই একটু দায়িত্বশীল হতে হবে!



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ