মঞ্জুর মোর্শেদ : প্রয়াত মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী এডভোকেট মোঃ ছায়দুল হকের বহু চর্চিত বিষয় এটি। বহুল আলোচিত বটে। তিনিই সর্বপ্রথম এবং তখনকার সময়ের একমাত্র এমপি যিনি প্রধানমন্ত্রীকে টাকা ফেরত দিয়েছেন।
সম্ভবত ১৯৯৬ সাল। ষষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকট। আওয়ামীলীগের মননোয়ন প্রাপ্ত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পেয়েছে। ২৪৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া -১(নাসিরনগর) আসনে মননোয়ন পেয়েছেন এডভোকেট মোঃ ছায়েদুল হক। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে মননোয়নপ্রাপ্ত এমপি পদপ্রার্থীদের ঢাকায় জরুরী তলব করেছেন দলীয় সভানেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সকল প্রার্থীদের নিয়ে জরুরী বৈঠক করেন এবং বলেন, আপনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর নৌকা তুলে দিলাম। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে নৌকার জয় ছাড়া বিকল্প নাই। সবাই জয় নিয়ে ফিরবেন আশা করি।
জননেত্রী শেখ হাসিনা মননোয়ন প্রাপ্তদের আওয়ামীলীগের দলীয় ফান্ড থেকে নির্বাচনী কাজে ব্যয় করার জন্য প্রত্যেককে দলীয় ফান্ড হতে কিছু টাকা উপহার প্রদান করেন।স্থান ভেদে বিভিন্ন এমপি প্রার্থীরা প্রত্যেকে কম - বেশী টাকা পেয়েছিলেন।ব্রাহ্মণবাড়িয়া -১ (নাসিরনগর) আসনের ছায়েদুল হক দলীয় ফান্ড থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন।
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ, নিরেপক্ষ, সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর ক্ষমতায় এলো আওয়ামীলীগ সরকার।প্রথমবারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুর তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা।
নির্বাচনে জয়ী সকল সংসদ সদস্যগণ দলীয় সভানেত্রী বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত ও অভিনন্দন জানাতে গেলেন।
তাদের মধ্যে ছায়েদুল হক ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গেলেন, তবে সঙ্গে নিয়ে গেলেন একটি ব্রিফকেস।
সালাম বিনিময়, শুভেচ্ছা, অভিনন্দন জ্ঞাপন শেষে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বললেন - নেত্রী নির্বাচনের পূর্বে আপনার দেওয়া ৫০ লক্ষ টাকা আমি ফেরত নিয়ে এসেছি। আমার ওই টাকাটা নির্বাচনী কাজে খরচ হয়নি। কারন আমার জনগণ আমাকে খরচ করতে দেয়নি। তারা নির্বাচনের সকল ব্যয়ভার বহন করেছে এবং নৌকা প্রতীকে আমাকে ভোট করেছে।টাকাটা আপনি রেখে দিন।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছায়েদুল হকের কথা শুনে হতভম্ব।গর্বে বুকটা ভরে গেলো।
তিনি ভাবলেন, পৃথিবীতি আজো এমন সৎ মানুষ আছে তাহলে? এ পর্যন্ত কেউ তো এমনটা করলো না।
তিনি বললেন,সত্যি আজ আমি গর্বিত।আপনার সম্পর্কে যা শুনে এসেছি আজ তার প্রমাণ পেলাম।আপনি আসরেই নির্লোভ মানুষ। আপনিই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারন করা সত্যবাদী ঘনিষ্ট সহচর।
এডভোকেট মোঃ ছায়েদুল হক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দিয়ে ফিরে আসছিলেন। পেছন থেকে নেত্রী আবার ডাকলেন- হক সাহেব একটু শুনে যাইয়েন তো...
জননেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে তিনি আবার নেত্রীর সামনে গেলেন - আপনি টাকাগুলো নিয়ে যান। খরচ হয়নি বুঝতে পেরেছি। আপনার প্রতি আমি খুশী। এই টাকা আপনি নিজে খরচ করবেন, এটা আপনার প্রাপ্য।
ছায়েদুল হক সাহেব বললেন - নেত্রী আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষ খুউব গরীব। আমি গরীব এলাকার গরীব এমপি। আমার টাকা দরকার নাই। তাছাড়া টাকাটা দলীয় ফান্ডেই জমা থাকুক। দলের অনেক দুর্দিন গেছে টাকাটা কিছুটা হলেও কাজে লাগবে। আমি যাদের জন্য এমপি হয়েছি, আপনি শুধু আমার নাসিরনগরের মানুষকে একটু দেখবেন।এর বেশী কিছু চাইনা।
ছায়েদুল হকের কথাগুলো শুনে আনন্দে কেঁদে ফেললেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি সবাইকে ডেকে বললেন - দেখো দেখো আমাদের একজন ছায়েদুল হক আছে, তিনি একজন সৎ মানুষ।
তিনি দেশকে ভালোবাসেন, তিনি এলাকার মানুষকে ভালোবাসেন। এমন দরদী মানুষ থাকতে বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগকে ঠেকায় এ সাধ্য কার আছে!
সেই থেকে সততার মূর্ত প্রতীক ছায়েদুল হককে ভীষণ শ্রদ্ধা করতে স্বয়ং শেখ হাসিনা।
ছায়েদুল হককে কখনো মননোয়নের জন্য কারো কাছে ধর্ণা দিতে হয়নি।চিন্তা করতে হয়নি।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যেমন নাসিরনগরের সৎ মানুষটির জন্য মননোয়নপত্রটি সবসময় আলাদা করে রাখতেন,তেমনি এডভোকেট মোহাম্মদ ছায়েদুল হক জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সকল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার জয় উপহার দিয়ে গেছেন।এডভোকেট মোঃ ছায়েদুল হক মনননোয়ন কিংবা মন্ত্রীত্বের জন্য লবিং করতেন না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেটা জানতেন,তাই তিনি এডভোকেট মোঃ ছায়েদুল হক তথা নাসিরনগরবাসিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মধ্যে প্রথমবার মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এখানেও মন্ত্রীত্বের চারবছরের কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশের মৎস্যখাত কে সারাবিশ্বের মধ্যে চতুর্থতম স্থানে উন্নীত করে গেছেন।
সৎ ও সততার বিরল দৃষ্টান্ত এডভোকেট মোঃ ছায়েদুল
হক আজ নেই। অথচ নাসিরনগরে আকাশ বাতাস নদী হাওড়ে ধ্বনিত হচ্ছে ছায়েদুল হকের নাম। তিনি অমর।

0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা