শেষ খবর

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widge

Responsive Advertisement

গাজা'র হাজারো মুসলিম মৃত্যুর সাথে যে বাঙ্গালী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন

(ছবি: প্রতীকী)

মঞ্জুর মোর্শেদ : আপনিও শুনলে অবাক হবেন, আজ গাজা'র উপরে এই যে ইসরাইলি বিমানগুলো উড়ে গিয়ে বোমা নিক্ষেপ করে পলকে উধাও হয়ে যাবার সুযোগটি পাচ্ছে তার মূল কৃতিত্বের অধিকারী একজন বাঙালী!? একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীই পৃথিবীতে ফাইটার জেটের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী ইঞ্জিনের সবচেয়ে সফিস্টিকেটেড পার্ট তৈরীর করেন যা ব্যবহার করছে ইসরাইল! মুসলিমের মেধা কিনে নিয়ে তা ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের‌ উপরেই মুহুর্মুহু বোমা ফেলে বোঝার আগেই গায়ের হয়ে যায় ইসরাইলী বিমান...

ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী তথা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন এরকম বিজ্ঞানীর সংখ্যা খুব একটা বেশী মেলে না। ফজলুর রহমান খান, কুদরত-ই-খুদা, ওয়াজেদ মিয়া, জামাল নজরুল ইসলাম, মাকসুদুল আলম এবং আর হাতে গোনা কয়েকজনের নাম বললেই তালিকা শেষ। অনেকে অবশ্য ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া জগদীশ চন্দ্র বসুকেও আমাদের বিজ্ঞানী বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন, তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদেরই নিজেদের মাটিতে জন্ম নেয়া বিজ্ঞানী, যিননি আমাদের দেশেই লেখাপড়া করেছেন, পরবর্তীতে আমেরিকা গিয়ে নানামুখী গবেষণা করে বিজ্ঞান-সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই লোকটির নাম‌ই আমরা সকলেই ভুলে যেতে বসেছি, অধিকাংশরা তো তার নাম জানিই না। যার কথা বলছিলাম, প্রাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে থাকা ওই বিজ্ঞানীর নাম আবদুস সাত্তার খান, এক বিস্ময়কর মেধাবী।

১৯৪১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার খাগাতুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুস সাত্তার খান। গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন সাধারণ ঘরে সাত্তারের জন্ম হয়েছে যে তার জন্মের নির্দিষ্ট তারিখটিও সংরক্ষিত নেই। মাত্র আট বছর বয়সে বাবা মারা গেলে অকূল পাথারে পরেন খানের মা। ফলে খানকে নিয়ে তিনি বাধ্য হয়েই পিত্রালয়ে চলে যান। নানাবাড়িতেই খানের কৈশোর কাটে। আরদশটা গ্রামের বাচ্চাদের মতোই বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরের একটি স্কূলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সাত্তার খান রতনপুর আবদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বোর্ড স্ট্যান্ড করেন মাধ্যমিকে আর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ালেখা শেষ করে সুযোগ পান দেশ সেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে, পেয়ে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্কলারশিপ।

আবদুস সাত্তার খান অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফেরেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, এরই মাঝে শুরু হয়ে যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৫শে মার্চের সেই ভয়াল কালো রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হাজারো নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, সেদিন হানাদার বাহিনীর নির্মম আক্রোশের শিকার হতে পারতেন সাত্তার খান নিজেও। তবে সেদিন তিনি অনেকটা অলৌকিকভাবেই বেঁচে গিয়েছিলেন।

সাত্তার খান জানান, সেদিন পাক সেনারা চলে এসেছে বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে বাইরে পালানোর আর কোনো উপায় নেই। তাই হতবুদ্ধি হয়ে খাটের নীচে ঢুকে চুপচাপ শুয়ে রইলেন তিনি। পাকিস্তানি সৈন্যরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে কাউকে না পেয়ে বিস্ময়করভাবে চলে যায়! একজন সৈন্য যদি সেদিন হাঁটু গেড়ে বসে খাটের নীচটা দেখার চেষ্টা করতো, তাহলে কি হতো ভাবলেই শরীর শিউরে উঠে...

এরপর দেশ স্বাধীন হবার পরেও কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন মেধাবী আবদুস সাত্তার খান। পরবর্তীতে বাংলাদেশে সুযোগ নাই বিধায় উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ওখানে গিয়ে ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রাথমিক ভাবে অধ্যাপনাও করেছেন। এরপর আইওয়া, লুইস রিসার্চ সেন্টার, নাসার ইউনাইটেড স্পেস আর আলস্টমের ধারাবাহিকতার কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। আবদুস সাত্তার খান তার বাকি জীবনটা তিনি আমেরিকাতেই কাটিয়েছেন সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে। অবশ্য দেশের টানে তিনি একাধিকবার বাংলাদেশেও এসেছেন। এমনকি দেশের বিপদেও তিনি তার সাধ্যমতো সাহায্য করতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের মানুষ ভয়াবহ বন্যার কবলে পরলে তখন আবদুস সাত্তার খান একক প্রচেষ্টায় ৬১ হাজার ডলার সংগ্রহ করে রেড ক্রসের মাধ্যমে বন্যাদুর্গতদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশে প্রেরণ করেন।

আবদুস সাত্তার খান ১৯৭৩ সালে সংকর ধাতু নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য দেশ ত্যাগ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এএমএস গবেষণাগারে ২ বছরের জন্য যোগ দেন। সে সময়টা ছিল জেট ইঞ্জিনের উন্নয়নকাল। জেট ইঞ্জিন তৈরির খরচ কমাতে এবং বিমানকে আরো গতিময় করতে তখন প্রচুর গবেষণা হচ্ছিল। তিনিও যোগ দিলেন সে ধারায়। সে সময় জেট ইঞ্জিনের বড় একটি সমস্যা ছিল ঘর্ষণের ফলে এর পিস্টন ক্ষয়ে যাওয়া। এছাড়াও ইঞ্জিনে জ্বালানির দহনে যে উচ্চ তাপ উৎপন্ন হয়, তা সহনশীল কোনো ধাতুর সাথে তখনও কারো পরিচয় ছিলো না। ফলে দরকার পরছিল উপযুক্ত সংকর ধাতুর ব্যবহার। যার জন্য অধিকাংশ গবেষণার মূল উপজীব্য ছিলো শক্তিশালী সংকর ধাতু উৎপাদন, যা কি না বিমান তৈরি এবং জেট ইঞ্জিনের জন্য উপযোগী হবে।

তখন এ গবেষণায় দুর্দান্ত সাফল্য পান বাঙ্গালী বিজ্ঞানী সাত্তার খান। আইওয়াতে আড়াই বছরের গবেষণায় দশের অধিক অ্যালয় তথা সংকর ধাতু তৈরি করেন তিনি। পুরো ক্যারিয়ারে তার তৈরি অ্যালয়ের সংখ্যা ৪০। বৈচিত্র্যময় এসব অ্যালয় উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যবহার উপযোগী। গ্যাস টারবাইনের ব্লেডের প্রান্ত কিংবা জেট ইঞ্জিনে এসব অ্যালয় বেশ উপযোগিতার প্রমাণ দেয়।

এরপর ১৯৭৬ সালে নাসার লুইস রিসার্চ সেন্টারে গবেষণা শুরু করেন সাত্তার খান। ওখানে গিয়ে তিনি মহাকাশযানে ব্যবহারোপযোগী সংকর ধাতু নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার গবেষণার ফলস্বরূপ তৈরি হয় নিকেল ও অ্যালুমিনিয়ামের একপ্রকার অত্যন্ত উন্নতমানের সংকর। এই ধাতু বিমানের জ্বালানী সাশ্রয় করে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে, বাড়ায় কার্যক্ষমতা। ফলে এর ব্যবহার ছিল রকেটেও।

অন্যদিকে মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য দ্রুতগতির এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান তৈরির কাজে সরাসরি নিযুক্ত হন তিনি। ৭০’এর দশকে বিমান তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা তিনটি জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের একটি প্রাট অ্যান্ড হুইটনি সাত্তার খানের গবেষণায় ভবিষ্যৎ সাফল্য দেখতে পায়। তাই এ কোম্পানিটি খানকে গবেষণার জন্য অর্থায়ন করে। অর্থায়নের ফলে তার জন্য কাজ করাটা সহজ হয়ে যায়। তার গবেষণা থেকে উৎপন্ন নিকেল ও তামার মিশ্রণই ব্যবহৃত হয় বিমানের ইঞ্জিন তৈরিতে। এই ধাতু হালকা হওয়াতে ইঞ্জিনের ওজন কমে যায়, পাশাপাশি কর্মদক্ষতা এবং গতি বৃদ্ধি পায়। এ আবিষ্কারের জন্য সাত্তার খান ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। নাসা ইউনাইটেড টেকনোলজি একে ২০ শকতের বিমান গবেষণায় শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বলে আখ্যায়িত করে। বিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘পপুলার সায়েন্স’ একে বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কারগুলোর একটি বলে অভিহিত করে।

এরপর একুশ শতকের আগমনের সাথে সাথে আবদুস সাত্তার খান তার কর্মস্থল পরিবর্তন করেন। যদিও প্রাট অ্যান্ড হুইটনিতে যথেষ্ট সুখেই ছিলেন, তথাপি তিনি বলেছিলেন যে একস্থানে কাজ করতে করতে তার একঘেয়েমি ধরে গিয়েছে। যোগ পেলেন সুইজারল্যান্ডের আলস্টম কোম্পানিতে। উল্লেখ্য, জ্বালানি উৎপাদনের জন্য এটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে মাত্র পাঁচ বছর কাজ করেই সাত্তার খান তার নামের পাশে যোগ করেন ২৫টি পেটেন্ট। আলস্টমে যাবার পর তার প্রধান সাফল্য ছিলো টারবাইনের জন্য অধিক কার্যকরী ব্লেড এবং দ্রুতগতির ট্রেনের জন্য সংকর ধাতু তৈরি। এছাড়াও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্যে তার গবেষণার অবদান অপরিসীম। তার কল্যাণে উন্নত রূপ লাভ করা তেমনই কিছু বাণিজ্যিক পণ্যের কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

🔘 কাটিং-এজ জেট ইঞ্জিনের জ্বালানি বাষ্পে তার তৈরি ন্যানো-ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করা হয়, যা অর্থসাশ্রয়ী।

🔘 তার গবেষণা যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিনকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধবিমান অধিক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারছে।

🔘 প্রাট অ্যান্ড হুইটনিতে থাকাকালীন তার গবেষণার কল্যাণে তাপীয় অবসাদ ও ক্ষয়রোধী প্রলেপ দেয়ার পদ্ধতি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সাফল্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

🔘 আলস্টম কোম্পানির ব্যবহৃত গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিন উন্নয়নে তার অবদান সবচেয়ে বেশি।

🔘 আলস্টমের অত্যাধুনিক জি-১১ গ্যাস টারবাইনে ব্যবহৃত হচ্ছে আবদুস সাত্তার খানের আবিষ্কৃত জারণরোধী প্রলেপযুক্ত যন্ত্রাংশ।

এত আবিষ্কার, উদ্ভাবনে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার গড়া এ মানুষটির জন্ম আমাদের বাংলাদেশে, যা জেনে আমাদের গর্ব হয়।

তবে সাত্তার খান যদি তার নানা-নানীর কাছে চারিত্রিক দৃঢ়তা পেয়ে থাকেন, তাহলে মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা। তিনি জানান, মায়ের কথা ভাবতে ভাবতেই প্রতিদিন ২ মাইল কাঁদা-বালুর পথটি কখনো বৃষ্টি, কখনো প্রখর রোদ্দুর মাথায় নিয়ে অনায়াস

প্রিয় পাঠক, উপসংহারে একটা কথা বলতে চাই, "আগে এসব বিজ্ঞানীদের নিয়ে গর্ব হোতো, এখনও হয় বললে মিথ্যা বলা হবে। এমনটা হবার কারণ হিসেবে বলতে হয়, তাদের মেজর কন্ট্রিবিউশানে তৈরী বিমানগুলোই আজ হাজার হাজার মুসলিমের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, এটা ওপেন সিক্রেট। যদি প্রশ্ন করি, এর দায়ভার কি আব্দুস সাত্তার খান নিবেন? হয়ত না। তাছাড়া তাকে দোষারোপ করাও একার্থে ঠিক হবেনা।

তবে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অন্তত একটা প্রশ্ন উত্থাপন করতেই পারি, “আপনার মেধা আপনি কাকে দিবেন?" যদি ভেবে-চিন্তে জেনে-বুঝে জালেমকে আপনি আপনার মেধা দিয়েও সাহায্য করেন, তবে কাল কিয়ামতের ময়দানে মজলুমের রক্তের হিসেব চুকাতে আপনাকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, এবিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ