১০০ বছরের বেশি সময় ধরে নোবেল পুরস্কার সাহিত্য ও বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বিশ্ব শান্তিতে অবদান রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। এটি এমন ব্যক্তিদের দেওয়া হয় যারা মানব কল্যাণে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের গোঁড়ার কাহিনী কিংবা আলফ্রেড নোবেলের জীবনী অন্যরকম গল্প বলে। এই মহান পুরস্কারের গোঁড়ার গল্প গড়ে উঠেছে হাজার হাজার মৃতদেহের উপর।

নোবেল পুরস্কার সাহিত্য ও বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বিশ্ব শান্তিতে অবদান রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত; Image Source: interestingengineering.com
নোবেল এমন একটি বিস্ফোরক আবিষ্কার করেছেন যা ঐ সময়ে কেউ জানতো না এবং একটি অত্যন্ত কার্যকরী ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নোবেল পুরষ্কারের উইল করে যান তিনি।১৯৪৫ সালে জাপানে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর এক ভাষণে ১৯২১ সালে নোবেল বিজয়ী সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন একথা বলেন।
আলফ্রেড নোবেলের পরিচয়
আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল ১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন উদ্ভাবক এবং প্রকৌশলী, যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় সংগ্রাম করেছেন দারিদ্র্যের সাথে। দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় ইমানুয়েল সুইডেন ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তিনি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান এবং কাজ শুরু করেন।
রাশিয়ায় তিনি এমন বিস্ফোরক আবিষ্কার করেন যা নৌবাহিনীকে আক্রমণ করতে সক্ষম এবং অবশেষে তার আবিষ্কার সাফল্যের মুখ দেখতে সক্ষম হয়। ইমানুয়েল তার স্ত্রী এবং আট সন্তানদের সেন্ট পিটার্সবার্গে নিয়ে যান। পুত্রদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন সেখানে। আলফ্রেড রাশিয়ান শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠে। একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, কবিতা এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানে শিক্ষা লাভ করেন তিনি।

বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন উদ্ভাবক এবং প্রকৌশলী; Image Source: dbs.bh.org.il
কবিতায় অ্যালফ্রেডের আগ্রহ ইমানুয়েলের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়ায়। তিনি রসায়ন ও প্রকৌশলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আলফ্রেডকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। প্যারিসে পড়াশোনা করার সময়, নোবেল ইতালীয় রসায়নবিদ অসানিও ওসোবারোর সাথে দেখা করেন। যিনি ১৮৪৭ সালে নাইট্রোগ্লিসারিন আবিষ্কার করেছিলেন। নাইট্রিক অ্যাসিড এবং সালফিউরিক এসিডের সাথে গ্লিসারিন মিশিয়ে এই তৈলাক্ত তরল বিস্ফোরক আবিষ্কার করেন তিনি।ট্রাজেডি থেকে উদ্ভাবন
যদিও ব্যবহারিক কাজে নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহার করার জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয় কিন্তু নোবেল পরিবার এটির বাণিজ্যিক ব্যাবহার নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে। যার ফলে রাশিয়া ও সুইডেনে এই পরিবার বেশ কিছু ব্যবসা সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
১৮৬৪ সালে সুইডেনের একটি কারখানায় এক বিস্ফোরণে আলফ্রেডের ছোটভাই এমিল সহ কয়েকজন নিহত হয়েছিল; Image Source: ushistoryhonorschloe.weebly.com
কিন্তু তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিছু দুঃখজনক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। ১৮৬৪ সালে সুইডেনের একটি কারখানায় এক বিস্ফোরণে আলফ্রেডের ছোটভাই এমিল সহ কয়েকজন নিহত হয়েছিল। এই বিপর্যয়টি অ্যালফ্রেডকে নাইট্রোগ্লিসারিনের নিরাপদ ব্যবহার খুঁজে বের করতে উৎসাহ যোগায়। প্রাথমিকভাবে নাইট্রো এবং গান পাউডার ব্যবহার করে ‘বিস্ফোরক তেল’ তৈরি করেন অ্যালফ্রেড। যা বেশ কয়েকটি মারাত্মক বিস্ফোরণের কারণ ছিল এবং সানফ্রান্সিসকোর স্টোররুমে একটি বিস্ফোরণে প্রায় ১৫জন নিহত হয়।
অবশেষে ১৮৬৭ সালে নাইট্রোগ্লিসারিনের সাথে ডায়োটোমাসিয়াস আর্থ মিশিয়ে নাইট্রোগ্লিসারিন পেস্ট তৈরি করেন। যা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং ছোট কাঠির মতো করে তৈরি করা যায়। মাইনিং কোম্পানিগুলো এই সটীকগুলো ব্যবহার করে পাথরে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারতো। নোবেল এই আবিষ্কারটির পেটেন্ট তৈরি করেন ‘ডিনামাইট’ নামে। গ্রিক শব্দ ডুনামিসবা থেকে নেওয়া এই নাম, যার অর্থ শক্তি।
ডিনামাইটের এই আবিষ্কার খনি, নির্মাণ ও ধ্বংস শিল্পে বিপ্লব নিয়ে এলো। রেলরোড কোম্পানি গুলো তখন খুব সহজেই পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারতো। অনুসন্ধান ও বাণিজ্যে এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। ফলস্বরূপ নোবেল, যে তার আবিষ্কারের ৩৫৫টি পেটেন্ট অর্জন করেছিল, ডিনামাইটের মাধ্যমে তার সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে গেল।

মৃত্যু ব্যবসায়ী
ডিনামাইটের অন্যান্য ব্যবহারও ছিল। খুব বেশী দিন লাগলো না, সামরিক কর্তৃপক্ষ যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা শুরু করলো। স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধে ডিনামাইটের কামান ব্যবহার করা হলো। যদিও নোবেল সামরিক কাজে ডিনামাইট ব্যাবহারের অনুমতি দিয়েছিলো কিনা সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি।
যাইহোক এটা ছিল ১৮৮৮ সাল যখন নোবেল জানতে পারে যে তার সম্পর্কে অন্যরা কি ভাবে। তার ভাই লুডভিগ মারা যাওয়ার পর কিছু সাংবাদিক ভুল করে নোবেলের মৃত্যুর খবর ছেপে বসে। আলফ্রেডের মৃত্যুর খবর ব্যাপকভাবে ছাপা হয়েছিল একজন আবিষ্কারক কিংবা ব্যবসায়ী হিসেবে নয় বরং এমন লোক হিসেবে যে কিনা লক্ষ লক্ষ লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
একটি ফরাসি খবরের কাগজ ছাপে ‘লে মার্চেন্ড দে লা মর্ট এস্ত মর্ট’ অর্থাৎ ‘মৃত্যু ব্যবসায়ীর মৃত্যু’। এই খবর গুলো নোবেলকে এমন একজন মানুষ হিসাবে বর্ণনা করে যে কম সময়ে অধিক মানুষ হত্যা করার উপায় আবিষ্কার করেছে।

নোবেল এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন যার ফলে সারা পৃথিবী তাকে নায়ক হিসেবে মনে রাখবে; Image Source: interestingengineering.com
নোবেল তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে অবাক হয়ে যান এবং এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন যার ফলে সারা পৃথিবী তাকে নায়ক হিসেবে মনে রাখবে। ১৮৯৬ সালে মারা যাওয়ার এক বছর আগে, নোবেল উইল করে নোবেল পুরস্কারের ব্যবস্থা করে যান। যা জ্ঞান-বিজ্ঞান সহ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য অর্থ ও সম্মাননার ব্যবস্থা করে। ১৯০১ সাল থেকে ৫টি শাখায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরষ্কার দেওয়ার মাধ্যমে ঐ বছর থেকে মোট ছয়টি শাখায় নোবেল পুরস্কার দেওয়ার রীতি চালু হয়।
0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা