হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের নাম ট্রিটি রুম। সেই ট্রিটি রুমে দাঁড়িয়ে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। সেদিন প্রেসিডেন্ট বুশ দম্ভভরে বলেছিলেন, "আফগানিস্তানকে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে আমেরিকার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগব মাত্র।"
২০০১ থেকে ২০২১। কেটে গেল বিশ বছর। তবুও সেই কয়েক মুহূর্ত এখনো শেষ হয়ে নি। হবেও না। তার আগেই পালাতে বাধ্য হচ্ছে তারা।
যে ট্রিটি রুমে দাঁড়িয়ে বুশ যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন দীর্ঘ বিশ বছর পর সেই একই রুমে একই স্থানে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন লেজ গুটিয়ে মাথা নুইয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করার ঘোষণা দিলেন।
২০০১ সালে জো বাইডেন ছিলেন প্রভাবশালী সিনেটর। সেসময় তিনি যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। বুশকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। দুই টার্মের ওবামা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে। যুদ্ধের আগাগোড়া তার নখদর্পনে। কী পরিমাণ ব্যর্থ হলে বিশ বছর পর একজন প্রেসিডেন্ট বলতে পারে, "আমেরিকার দীর্ঘতম যুদ্ধের সমাপ্তি টানার সময় এসেছে। সময় এসেছে সেনাদের ঘরে ফিরিয়ে আনার।"?
আফগানিস্তানে মিত্রবাহিনী কূলকিনারা খুঁজে পায় নি। গলির চিপা গলি মনে করে আফগানিস্তানে এসে তারা অথৈ সাগরের মধ্যখানে পড়ে যায়। এমন ধারাবাহিক এবং সুশৃঙ্খল প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে তা তাদের কল্পনাতে ছিল না। ফুঁ দিয়ে ঈমানী বারুদ নিভিয়ে দিতে গিয়ে দাউদাউ করে জ্বলা প্রতিরোধের আগুনের স্ফুলিঙ্গে তারাই ঝলসে গেল।
২০১১ সালে আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্য ছিল এক লাখ দশ হাজার। সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য ছিল তখন। খরচ করেছে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলার। এতকিছুর পরেও কিছুই করতে পারে নি৷ মাঝেমধ্যে নোয়াতে পারলেও ভাঙতে পারে নি তাঁদের মনোবল।
টেক্সাসের আর্লিংটনে আছে জাতীয় সমাধিস্থল। সেখানেই যুদ্ধে নিহত সেনাদের শেষকৃত্য করা হয়। জো বাইডেন যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দিয়ে সোজা চলে যান আর্লিংটনে। সেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এখানেই সমাহিত আছে তার ছেলে বিউ বাইডেন। সে ইরাক যুদ্ধে নিহত হয়৷ জো বাইডেন আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, "গত ৪০ বছরের মধ্যে আমি প্রথম প্রেসিডেন্ট, যাঁর ছেলে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে ছিল। যুদ্ধের মাঠে সন্তানের উপস্থিতির অর্থ কী, আমি তা ভালো করেই জানি।"
বুঝাতে চাইলেন, এভাবে আর আমাদের সেনাদেরকে হারাতে চাই না। কাতারে কাতারে লাশ পড়ুক তা আমাদের কাম্য হতে পারে না৷ সুতরাং আমাদের উচিত তাদেরকে যতদ্রুত সম্ভব ঘরে ফিরিয়ে আনা।
আফগানিস্তানের মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিজয় একদিনে আসে নি। দীর্ঘ বিশ বছর রক্ত ঝরাতে হয়েছে তাঁদের। মাঠে থাকতে হয়েছে বছরের প্রতিটি দিন। বিশ বছরের প্রতিটি ক্ষণ। সবর করতে হয়েছে সবরের মতো। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন, সত্যের বিজয় হবে। এখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তাঁরা।
সুতরাং আপনি যদি দীর্ঘকাল কষ্ট, সীমাহীন দুর্ভোগ সহ্য করে ন্যায়ের পথে অটল থাকতে না পারেন তাহলে বিজয়ের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হবে না। ইতিহাস তা বলে না। বিজয়ের পথ অবশ্যই কণ্টকাকীর্ণ। তা মেনেই নামা উচিত।
(এ বি এম সামসুজ্জামান)
0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা