
আপনার চিন্তার জগত এলোমেলো করে দেবে এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরে রবার্ট রিপ্লি অমর হয়ে আছেন ইতিহাসে; Image Source: wikipedia
রবার্ট রিপ্লি দর্শকদের সামনে খুলে দিয়েছেন এক নতুন পৃথিবীর দরজা
রবার্ট রিপ্লি পৃথিবীব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেন ‘রিপ্লিস বিলিভ ইট বা নট!’ কলাম ও রেডিও অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে। ‘বিলিভ ইট অর নট (বিশ্বাস করুন আর নাইবা করুন)’ বাক্যটি সে সময় আলোচিত প্রবচনে পরিণত হয় রিপ্লির কল্যাণে।
তখন অল্প কিছু লোকেরই সখের বশে ভ্রমণ করার মতো অবস্থা ছিল। তাই বাইরের পৃথিবীর সাথে পরিচয়ের এবং জানার মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র অথবা রেডিও। রবার্ট লিওয়াই রিপ্লি বিদেশী রীতিনীতি, বিস্ময়কর সত্য সম্পর্কে অদ্ভুত সব তথ্য পাঠক এবং শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন। প্রতি সপ্তাহে মানুষের অসাধারণ সব কৃতিত্ব কিংবা অদ্ভুত কোনো গল্প নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন তিনি। তিনি ছিলেন তার কাজের মতোই অদ্ভুত চমৎকার একজন মানুষ যার কৌতূহল ছিল আকাশ ছোঁয়া।

রবার্ট লিওয়াই রিপ্লি বিদেশী রীতিনীতি, বিস্ময়কর সত্য সম্পর্কে অদ্ভুত সব তথ্য পাঠক এবং শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন; Image Source: maritimefun
রিপ্লির কাজ এখনো মানুষকে বিস্মিত করে। তিনি এমন একজন মৎস্য শিকারির ঘটনা তুলে ধরেন যিনি দুর্ঘটনাবশত চার পাউন্ড ওজনের সামুদ্রিক ব্যাস মাছ ধরেছিলেন শুধু মাত্র হাত হিয়ে। তিনি এমন একজন প্রতিযোগী সম্পর্কে বলেন যিনি ২৭ ঘণ্টা ১০ মিনিট বরফের টুকরার উপর বসে ছিলেন কিন্তু জ্বরের কারণে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পরেন।আমি ২০১টি দেশ ভ্রমণ করেছি, যার মধ্যে নরকও (নরওয়ে) ছিল। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে বিচিত্র যে জিনিসটি দেখেছি তা হচ্ছে মানুষ।রবার্ট রিপ্লি
রিপ্লি দূরদূরান্তে ভ্রমণ করে সব অদ্ভুত ঘটনাগুলো দর্শকের সামনে তুলে ধরতেন। এছাড়াও দর্শক শ্রোতাদের পাঠানো গল্প নিয়েও তিনি লিখতেন। যার মধ্যে ছিল এক কুকুরের ক্যালিফোর্নিয়ার শহরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা যার দলিল লেখা হয়েছিল ডিমের খোসার মধ্যে।
রবার্ট রিপ্লির প্রথম জীবন
রবার্ট রিপ্লি আনুমানিক ১৮৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা রোজাতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাধর তরুণ ক্রীড়াবিদ এবং তার ইচ্ছা ছিল বেসবল খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ার করা। কিন্তু খেলোয়াড় জীবনের প্রথম দিকেই এক ম্যাচে হাত ভেঙ্গে ফেলেন তিনি, যার কারণে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
বেসবল দলের জন্য রিপ্লিকে সময়ের প্রয়োজনে নানান ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। দলের হয়ে প্রমোটরের কাজও করেছেন একসময়। তিনি ছিলেন চমৎকার চিত্রশিল্পী এবং বেসবল খেলা জনপ্রিয় করার জন্য টিম পোস্টার আঁকা শুরু করেন তিনি। তার অঙ্কিত চিত্র সানফ্রান্সিসকো সংবাদপত্রের সম্পাদকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সম্পাদক রিপ্লিকে অতি শীঘ্রই কার্টুনিস্ট হিসাবে খেলাধুলা বিভাগের জন্য ভাড়া করেন।

পৃথিবী অত্যন্ত বিচিত্র একটি জায়গা; Image Source: vanityfair
কার্টুনিস্ট হিসেবে তিনি রবার্ট রিপ্লে নামে লেখতে থাকেন। ১৯১২ সালে রিপ্লি নিউইয়র্কে চলে যান এবং দ্য নিউইয়র্ক গ্লোবে কাজ শুরু করেন। পরে নিউ ইয়র্ক পোস্টের হয়েও লেখেন। ‘বিলিভ ইট অর নট ‘ সিরিজটি ১৯১৮ সালে প্রচার হওয়া শুরু হয়। যখন রিপ্লি একটি নতুন ধারার অনুষ্ঠান নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছিল, তিনি তার আঁকা বিস্ময়কর তথ্য সম্বলিত ছবিগুলো একত্র করার সিদ্ধান্ত নেন।মাঝেমাঝে পৃথিবীর সবচেয়ে চমকপ্রদ জিনিসটি খুব সাধারণ আর একঘেয়ে লাগে শুধুমাত্র আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।রবার্ট রিপ্লি

রিপ্লি তার আঁকা বিস্ময়কর তথ্য সম্বলিত ছবিগুলো একত্র করার সিদ্ধান্ত নেন; Image Source: maritimefun
যার মধ্যে অন্যতম ছিল এক ব্যক্তির ১১ সেকেন্ডে ১০০ গজ লাফিয়ে পার হওয়া, অন্য একটি ছিল একজনের ১১৮০০ বার ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পরা এবং তৃতীয়টি ছিল এক ব্যক্তির ছয় মিনিটের জন্য পানির নিচে ডুবে থাকা। মূলত এই ফিচারটি ‘চ্যাম্পস অ্যান্ড চাম্পস’ নামে প্রকাশিত হয়। সময়ের সাথে, রিপ্লি কলামের ধরণ পরিবর্তন হতে থাকে। শুধুমাত্র খেলাধুলা নয় বরং বিজ্ঞান, রাজনীতি, ইতিহাস সহ নানান অদ্ভুত ঘটনা যোগ হতে থাকে তার কাজে। এক সময় তার কলামটির শিরোনাম পরিবর্তিত হয়ে পরিণত হয় ‘বিলিভ ইট অর নট’ এ। যা আজীবন বেচে থাকবে ‘রিপ্লির বিলিভ ইট অর নট’ নামে।
অবশেষে তাঁর কাজ প্রকাশক মুগাল উইলিয়াম রান্ডলফ হারস্টের মনোযোগ আকর্ষণ করে। অতঃপর ১৯২৯ সালে ১৭ টি পত্রিকায় রিপ্লির কলাম প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সাল নাগাদ ৩৩টি দেশে ৩২৫টি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রিপ্লির অবিশ্বাস্য সব ঘটনা এবং এর পাঠক সংখ্যা প্রায় ৮০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।

সময়ের সাথে, রিপ্লি কলামের ধরণ পরিবর্তন হতে থাকে; Image Source: pinterest
আমি ছেলেবেলায় এতোটাই অবিশ্বাস্য রকমের কদাকার ছিলাম যে আমার মা আমার ছবি তুলে ‘রিপ্লিস বিলিভ ইট অর নট’ এ পাঠিয়েছিল। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না জানিয়ে আমার ছবি ফেরত পাঠায়।জোয়ান রিভারস (আমেরিকান কৌতুক অভিনেত্রী, লেখক, প্রডিউসার, উপস্থাপক)
রবার্ট রিপ্লি বিতর্ক ভয় পেতেন না
১৯২৭ সালে চার্লস লিনবার্গ যখন একা একা আটলান্টিক উড়ে পার হলেন, রিপ্লি জানতো যে এটা প্রথমবারের মত নয়। লিনবার্গের ফ্লাইটের আগেও দুটো ডাইরিজিবল এবং একটি দুই সিট বিশিষ্ট বিমান আটলান্টিক উড়ে পার করেছে। যদিও চার্লস ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যে একা একাই উড়ে আটলান্টিক পার হয়েছে।রিপ্লি এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বলেছিলেন যে লিন্ডবার্গ ছিল ৬৭তম ব্যক্তি যে নন-স্টপ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। আর এর প্রতিবাদে রিপ্লির অফিসে প্রায় ১৭৫০০০ চিঠি আসে। কিন্তু রিপ্লি তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। তিনি উল্লেখ করেন ১৯১৯ সালে দুজন ব্রিটিশ বৈমানিক এর আগে আটলান্টিক পার হয়েছে। একই বছর একজন ইংরেজ ৩১জন সদস্য নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেয়। তাই চার্লস লিনবার্গকে টেকনিক্যালি ৬৭তম ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন রিপ্লি।
0 মন্তব্যসমূহ
Do good not be good.
- সাফকথা